রবিবার, ২৮ Jun ২০২৬, ০৩:১৯ পূর্বাহ্ন
সীতাকুণ্ডের বেসরকারি বিএম কনটেইনার ডিপোতে যে মানবিক ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে, এর পেছনে দুর্যোগ প্রতিরোধজনিত ত্রুটির বিষয়টিই সামনে আসবে। প্রথমেই আমি বলব, এ ধরনের বিস্ফোরকভর্তি কনটেইনারগুলো কেন্দ্রীয় ডিপোতে না রেখে সম্পূর্ণ আলাদা ব্যবস্থায় রাখা দরকার ছিল। কারণ এ ধরনের রাসায়নিকভর্তি কনটেইনারকে কোনোভাবেই অন্যান্য কনটেইনারের সঙ্গে রাখা যায় না। প্রাথমিক সতর্কতা হিসেবে এখানেই মূল দায়িত্বহীনতার কাজটি ঘটেছে।
আমরা জানি, এ ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে পুরো এলাকাটিতে দুর্যোগ নেমে আসে এবং শেষমেশ তা-ই হয়েছে। গতকাল রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ৪৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বহু মানুষ আহত হয়েছে, বহু সম্পদের হানি হয়েছে। এখনো সব তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে আশপাশের পরিবেশের ওপরও এর মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রভাব পড়বে, যা হয়তো আস্তে আস্তে জানা যাবে। খবরে দেখেছি, বিস্ফোরণের পর একেকটি কনটেইনার উড়ে ৩০০ ফুট দূরে গিয়ে পড়েছে। এর থেকে ভয়াবহতাটি আঁচ করা যায়।
সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, বিস্ফোরক রাসায়নিকভর্তি কনটেইনারগুলো মোটেও নিরাপদ স্থানে ও নিরাপদ উপায়ে রাখা হয়নি। যদি আলাদা রাখা হতো, তাহলে প্রথম অগ্নিকাণ্ডের পর বিস্ফোরকভর্তি কনটেইনার বিস্ফোরণ এড়ানো যেত।
এখানে আরেকটি ব্যাপার দেখা উচিত, যেকোনো ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য ডিপোটিতে ইমার্জেন্সি রেসপন্স (তাত্ক্ষণিক মোকাবেলা) ব্যবস্থা ছিল কি না। তাত্ক্ষণিক মোকাবেলা ব্যবস্থা হিসেবে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় যে ধরনের অগ্নিনির্বাপণের যন্ত্রপাতি ও উপকরণ এবং প্রশিক্ষণ থাকার কথা, সেখানে আদৌ ছিল কি না দেখার বিষয়। সে ধরনের ব্যবস্থা থাকলেও তা আদৌ ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটাও প্রশ্ন।
আমরা যদি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখি, সাধারণত যখনই কনটেইনার ডিপোগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে, সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা দিয়ে এটাকে প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে এটা করা হয়নি, এটা স্পষ্ট।
আরেকটা বিষয়, এসব বিস্ফোরক রাসায়নিক যারা পরিবহন ও মজুদ করেছে, তাদের ব্যবস্থাপনাটা সম্পূর্ণভাবেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল বলে আমি মনে করি। এভাবে কখনো বিস্ফোরক কনটেইনার পরিচালনা করা যায় না। ডিপোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ একেবারেই দায়িত্বহীনতার কাজ করেছে। এটা কখনোই হতে পারে না।
যে রাসায়নিকভর্তি কনটেইনারগুলোতে আগুন লাগার পর বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর জন্য আলাদা সুরক্ষা বেষ্টনী ছিল কি না এবং থাকলেও তা কতটা কার্যকর ছিল, সেটাও দেখা দরকার। নিশ্চয়ই সেটা ছিল না বা কার্যকর ছিল না। ফলে আমরা অসংখ্য মানুষের মৃত্যু, জখম এবং সম্পদহানি ও পরিবেশের ক্ষতি দেখতে পেলাম। মূলত বিস্ফোরণের আশঙ্কা রয়েছে এমন রাসায়নিকভর্তি কনটেইনার পর্যন্ত ভেন্টিলেটরসম্পন্ন জায়গায় রাখা উচিত।
এখানে আরেকটা প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, এই ডিপোতে কি শুধুই হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ছিল, নাকি অন্য কোনো তরল রাসায়নিক বা তরল ছিল, সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার।
রাসায়নিক দুর্যোগের প্রতিরোধের সম্ভাব্য ব্যবস্থা হিসেবে ডিপোতে একটি কন্ট্রোল রুমও থাকতে হবে। কিন্তু এই ডিপোতে নিজস্ব কন্ট্রোল রুম ছিল কি না, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। সেখানে স্মোক ডিটেক্টর, স্মোক অ্যালার্ম থাকতে হয়। সেখানে যদি স্বয়ংক্রিয় ধোঁয়া চিহ্নিতকারী যন্ত্র এবং ধোঁয়া সম্পর্কিত সংকেতব্যবস্থা থাকত, তাহলে সেটা কন্ট্রোল রুমে কম্পিউটারাইজড সিস্টেমে চলে আসতে পারত। সেটা নিশ্চয়ই ছিল না। তাদের হঠাৎ অগ্নিকাণ্ডে প্রতিরোধব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বিস্ফোরণ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সহায়ক ব্যবস্থা আদৌ সেখানে ছিল কি না। আমার ধারণা, সেটা ছিল না এবং একটি সনাতনি ব্যবস্থার অধীনে ডিপোটি পরিচালিত হয়ে আসছে। ফলে আগুন এতটা ছড়াতে পেরেছে।
খবরে জানতে পারলাম, কনটেইনার ডিপোতে রাত ৯টার দিকে প্রথম আগুন লাগে। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন রাত ১১টার দিকে আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণেও আনতে পারেন। কিন্তু এর কিছু পর পার্শ্ববর্তী কেমিক্যালভর্তি কনটেইনার বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। মূলত এরপরই আগুনের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ে এবং এত প্রাণ ও সম্পদহানির ঘটনা ঘটে।
এ প্রসঙ্গে আমাদের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সক্ষমতা-দক্ষতার ঘাটতির কিছু প্রশ্নও সামনে আসে। কারণ তাদের অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা বৈজ্ঞানিক ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সহায়ক, সেটা মূল্যায়ন করা দরকার। বিশেষ করে ভয়াবহ রাসায়নিক বিপর্যয় কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে সেই ধরনের প্রযুক্তি ফায়ার সার্ভিসের হাতে তাত্ক্ষণিকভাবে ছিল কি না। না হলে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর কেন পার্শ্ববর্তী রাসায়নিকভর্তি কনটেইনারে আগুন লাগবে, কেন সেটা ঠেকানো গেল না, ফায়ারকর্মীরা কেন সম্ভাব্য বিস্ফোরণের বিষয়টি আঁচ করতে পারলেন না, কেন তাঁরা নিজেদের সুরক্ষা নিয়ে ভাবতে পারলেন না—এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজা দরকার। ফলে আমার কাছে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও কারিগরি সক্ষমতার অভাব স্পষ্ট।
একটা জিনিস খেয়াল করা দরকার, এ ধরনের বিস্ফোরণের আগুন নেভানোর জন্য পানি উপযোগী নয়। তরল দাহ্য পদার্থের আগুন নেভানোর জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে শুরু করে যেসব উপকরণ থাকতে হয়, সেগুলো হাতের কাছে রাখা উচিত। কাজেই সেই ব্যবস্থাপনাটা আদৌ ছিল কি না—সেটাও প্রশ্ন।
আমি বলব, এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক কনটেইনার পরিবহন ও মজুদ করার বিষয়ে বিস্ফোরক অধিদপ্তর বা সরকারের সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার গাফিলতির বিষয়টিও সামনে আসবে। যেটাকে আমরা কম্বাস্টিভেল লিকুইড বলি, সেটা পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির অভাব ছিল। যেহেতু এটি একটি বেসরকারি ডিপো এবং এ ধরনের তরলভর্তি কনটেইনার যেখানে রাখা হচ্ছে, সেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার লোকজনের প্রতিদিনই পরিদর্শন করা দরকার ছিল। এ ঘাটতি অবশ্যই ছিল।
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে হলে বিস্ফোরণের আশঙ্কা রয়েছে এমন সব ধরনের রাসায়নিকভর্তি কনটেইনারকে আলাদা ব্যবস্থাপনায় রাখতে হবে। যে রাসায়নিকভর্তি কনটেইনার যেখানে রাখা হবে, সেখানে রাসায়নিকটির বিস্ফোরক ক্ষমতা এবং ভোলাটিলিটি বা উদ্বায়িতার মাত্রা কত এবং সেটা যদি উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক হয় এবং উচ্চমাত্রার উদ্বায়িতাসম্পন্ন হয়, তাহলে অবশ্যই এ ধরনের রাসায়নিকের কনটেইনারগুলো অন্যান্য কনটেইনারের সঙ্গে রাখার সুযোগ নেই।
লেখক : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক